লর্ড কার্জন। এই নামটির সাথে এদেশের সবারই পরিচয় আছে। আমিও আমার ছেলেবেলায় 1972 সালে এই নামেরেই একজন বড় ভাইয়ের সাথে পরিচিত হই। না উনি লর্ড কার্জন নন উনি হচ্ছেন আমাদের কার্জন ভাই। লম্বাচুড়া, সুঠাম দেহের অধিকারী মুখের ভাষা আরবি, হিন্দি, ইংরেজী এবং পুরাতন ঢাকা সহ শুদ্ধ ভাষায় কথা বলেন। রসিক এবং সাহসী টকবগে হেনসাম যুবক। আমার বড় ভাই বীরমুক্তিযোদ্ধা মোঃ লুৎফুল কবীর ভাইয়ের বন্ধু উনি। সেই 1972 সালে এই কার্জন ভাই বৌ বাজারের মরহুম শাহজাহান ভাই, টেনারীমোড়ের মরহুম নুরুল ইসলাম ভাই, চরকঘাটার আহসান উল্লাহ ভাই, রায়ের বাজারের নাদির খান ভাই, টালি অফিসের হিটি ভাই সহ অনেকেই দলবেঁধে আমাদের 45 ইমান আলী রোডের সোনাতনগড় বাড়ীতে আসতেন। গল্প গুজবে মেতে উঠতেন। নানা রকম খাওয়া দাওয়া সাহিত্য আড্ডা , পাড়ায় নাটক করার বিষয় নিয়ে আলোচনা, লেখা পড়ার আলোচনা, সদ্য স্বাধীনদেশ কতশত স্বপ্নের আলোচনা ছিল ওনাদের মাঝে। সেই সময়ে আমাদের একটি জিপ গাড়ি ছিলো, সেই গাড়ীটি মাঝে মাঝেই এই কার্জন ভাই ড্রাইভ করতেন এবং সব বন্ধুরা মিলে মাঝে মাঝেই জিপে করে বেড়াতে যেতেন। আমার মেজো ভাই বীরমুক্তিযোদ্ধা মোঃ লুৎফুর রাব্বী খোকন ভাইকেও দেখেছি উনাদের সাথে বিভিন্ন বিষয়ে শরিক হতে। আমার একেবারেই ছেলেবেলা তখন তবুও মনে আছে অনেক বিষয়ের ছোট ছোট দৃশ্যপট। একদিন আমরা সব ভাইবোন মিলে কার্জন ভাইয়ের সাথে আমাদের জিপে করে বেড়াতে যাই। কার্জন ভাই সেকি গাড়ির টান দেয়। এতো স্পিডে জিপ গাড়ী চালান কল্পনাও করা যায় না। খুবই এক্সপার্ট চালক। গাড়ীর কোন যান্ত্রিক গোলযোগ দেখাদিলে নিজেই দ্রুত সেরে ফেলেন কোন মিস্ত্রী লাগে না। যেন উনি কোন গাড়ি তৈরীর কারিগর। গাড়ির ইষ্টারিং ধরেই বলে ফেলতে পারেন গাড়ির কি সমস্যা। এমনই একজন গাড়ী প্রেমিক কার্জন ভাই জীবনে কতশত গাড়ী যে চালিয়েছেন আর কতশত বিকল গাড়ী যে সচল করেছেন তার কোন হিসাবই নেই। কার্জন ভাই একজন গাড়ী প্রেমিক সুন্দর মনের সদালাপি ভদ্র মানুষ। দেখতে দেখতে সময়ের বিবর্তনে কার্জন ভাইয়ের জীবনে বিয়ে, স্ত্রী, সন্তান, সংসার, সেই যুবক থেকে দেশের সিনিয়র নাগরিক সবইতো আমার চোখের সামনে ঘটেছে। সিকদার মেডিকেলের কাছে কার্জন ভাইয়ের গাড়ীর একটি ওয়ার্কসপ আছে মাঝে মাঝেই সেই রাস্তা দিয়ে আমার চলাচল করতে হয়। যত দূরই হোক উনার চোখে পরলেই এই ছোট ভাই বলে সেকি আন্তরিকতার ডাক, তারপর কাছে যাওয়া,কবির, খোকন কেমন আছে? বাড়ির সবাই কেমন আছে ইত্যাদি নানা কুশলাদি জানেন। সাদা ধব ধবে লম্বা লম্বা দাঁড়িতে কার্জন ভাইকে বেশ দেখায়। চা-নাস্তা খাওয়ার ব্যবস্থা, ছেলেবেলার ফেলে আসা দিনগুলোর স্মৃতি চারণ। আদি ঢাকা, নতুন ঢাকার কত অজানা নিয়ে আমার সাথে আলোচনা। চমৎকার একজন রসিক মানুষ, খুবই আলাপ প্রিয় একজন মানুষ। সততা আর সরলতায় পুরো শরীর কানায় কানায় ভরা। আমাদের পরিবারের সাথে ওনাদের পরিবারের দীর্ঘ সু-সম্পর্ক। উনার বাবা মরহুম মিলন খা (মিলন মামা) আর উনার ছোট চাচা মরহুম আনোয়ার খা (আনোয়ার মামা) দুজনেই সমাজ গড়ার জন্য, সমাজ সংস্কারের জন্য ফাতেমা ফাউন্ডেশন প্রদত্ত সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। উনার মেঝ চাচা খিজির খা ( খিজির মামা) ও সমাজ সেবায় বিশেষ অবদান রাখার জন্য ফাতেমা ফাউন্ডেশনের সম্মাননা পান। পারিবারিক ঐতিহ্য উপস্থাপন করার বিশেষ প্রয়োজন নেই কারণ এই পরিবার ঢাকার মোহাম্মদপুর, হাজারীবাগ ও ধানমন্ডি থানায়, বহুকাল যাবৎই নানা ধরনের নিঃস্বার্থ ভাবে নীরবে নীরবে জনহিতকর কাজ করে আসছেন। বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ধর্মীও প্রতিষ্ঠান সহ সমাজের কল্যাণকর কাজ করে আসছেন। আজ (26/08/21) হঠ্যাৎ ফেসবুকে দেখতে পাই আমার শ্রদ্ধেয় কার্জন ভাই যিনি আমার বড় ভাইয়ের ছেলেবেলার বন্ধু আমাদের পারিবারিক সদস্য ও বড় ভাই সেই টগবগে সাহসী যুবকের একটি বর্তমান সময়ের সাদা ধব ধবে লম্বা দাঁড়ি ওয়ালা আমার কার্জন ভাইয়ের ছবি।
তার… পর…. যা…….. হ…বা……..র…… তা……….ই ………
ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্নইলাহি রাজিউন
দ্রুত দেখতে যাই। মানুষের ঢল। ভির এড়িয়ে কাছে যাই সাদা কাপড়ে মোড়ানো। কার্জন ভাইয়ের নিথর দেহো খাটিয়াতে। আজ আর চঞ্চলতা নেই। আজ আর তিনি জানতে চাননি আমরা কেমন আছি। বসার জন্য চেয়ার দেখিয়ে দেন নি। বলেন নি আবার কবে দেখা হবে। কিছুক্ষন নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে ছিলাম ঘুমন্ত দেহের কাছে। শত শত মানুষ শেষ বারের মতো দেখে যাচ্ছেন। আজ দুপুর গড়িয়ে আছরের নামাজ শেষ হলো এবার জানাযার জন্য খাটিয়া নেয়া হলো নির্ধারিত স্থানে বহু মানুষের উপস্থিতিতে জানাযা হলো। কার্জন ভাইয়ের নিথর দেহের খাটিয়া কাঁধে নেয়ার জন্য প্রস্তুত সেবকের দল। কাঁধে করে কার্জন ভাইকে নেয়া হলো রায়ের বাজার বুদ্ধিজীবী গোরস্থানে। মাটিতে চিরনিদ্রায় সায়িত করে আমরা এক এক করে চলে এলাম ইতি টানা হলো জীবন্ত কার্জন ভাইয়ের অধ্যায়।
হে মহান সৃষ্টিকর্তা
আপনি ক্ষমা করুন।
দয়া করুন। মায়া করুন। কার্জন ভাইকে আপনার হেফাজতে রাখুন। হেফাজতে রাখুন সকল কবরবাসীদের।
শোকাহত
ফাতেমা ল কলেজ
ফাতেমা প্রি-ক্যাডেট স্কুল
সাথী নাট্য গোষ্ঠীর পরিবার বর্গ।
আমিন।
ছুম্মা আমিন।
২৬/০৮/২০২১ (রোজ- বৃহস্পতিবার)
লুৎফুল আহসান বাবু
এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।


