বর্তমানে ঈদ ও ইদ শব্দ নিয়ে চলছে বিতর্ক ।
প্রচলিত ‘ঈদ’ শব্দের পাশাপাশি অভিধানে ‘ইদ’ শব্দের অন্তর্ভুক্তির প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. শামসুজ্জামান খান বলেন, ‘এটি একটি বিদেশি শব্দ। আর বিদেশি শব্দ লিখতে ‘ঈ’ বা ‘ঈ’-কার নয়, ‘ই’ বা ‘ই’-কার লেখার নিয়ম। সে হিসেবেই বোর্ড সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাই ‘ঈদ’কে ‘ইদ’ও লেখা যাবে। তবে এই পরিতর্বনটি আমার একার সিদ্ধান্তে হয়নি। বোর্ড সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কেউ এ বিষয়ে আপত্তি জানালে বোর্ডকে জানানো হবে।’
শামসুজ্জামান খান আরও বলেন, ‘এই পরিবর্তনে এত মাতামাতি করার কিছু নেই। তবে আমার মনে হচ্ছে, জামায়াত অথবা কোনও উগ্রবাদী মতাদর্শের লোকজনের বিষয়টি নিয়ে বেশ মাথা ব্যথা শুরু হয়েছে।’
অভিধানে ‘ঈদ’-এর এমন সংস্কার নজরে আসার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শুরু হয় আলোচনা-সমালোচনা। যুক্তিতর্কের বন্যা বয়ে যাচ্ছে ফেসবুকে। কেউ কেউ বাংলা একাডেমিকে নিয়ে ফেসবুকে ঠাট্টা করছেন। কেউ আবার ‘ঈদ’ বা ‘ইদ’— কোনোটিই না লিখে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন ‘Eদ’ লিখে। গঠনমূলক সমালোচনাও করছেন কেউ কেউ। তারা বলছেন, বিদেশি শব্দ বলেই ‘ঈদ’ শব্দে ‘ঈ’-এর স্থানে ‘ই’ লেখা যাবে। কিন্তু ‘ঈ’ ব্যবহারের পেছনে তিনটি কারণ রয়েছে— শব্দের উৎস, অর্থ বিন্যাস ও উচ্চারণ।
বাংলা একাডেমি ব্যবহারিক বাংলা অভিধানে ‘ইদ’ শব্দের ভুক্তিতে নির্দেশ করা হয়েছে ‘ঈদ’ শব্দকেবাংলা ভাষাবিদ ও লেখক ড. হায়াৎ মাহমুদ এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘‘বাংলা শব্দে তো বহু বিদেশি শব্দ রয়েছে। নিজেদের শব্দ তো হাতেগোনা। ফলে সবই কি পরিবর্তন হবে? যে শব্দ যুগ যুগ ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে, সেটা পরিবর্তন করার কোনও কারণই দেখি না। এতে মানুষ ‘কনফিউজড’ হয়। যেহেতু কোনও ভুল নেই, সেহেতু পরিবর্তনেরও তো কোনও দরকার নেই। ‘ঈদ’ শব্দে ‘ই’-এর পরিবর্তে ‘ঈ’ ব্যবহারই সুন্দর।’’
কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক বলেন, ‘‘ই’ ও ‘ঈ’-এর মধ্যে উচ্চারণগত পার্থক্য অবশ্যই রয়েছে। ‘ঈদ’ যেহেতু আরবি শব্দ, ফলে এর উচ্চারণটা আরবি ব্যাকরণসম্মত। তাই বলে এতদিনের প্রচলিত শব্দে ‘ঈ’ বাদ দিয়ে ‘ই’ লিখতে গেলে বিদঘুটে লাগবে। তবে এও ঠিক, কেউ যদি ‘ই’ লেখে, তাকে অপরাধী বানানো যাবে না।’
‘ঈদ’ নয় ‘ইদ’ই টিকে যাবে
মোহাম্মদ আজম
বাংলা বানানের বর্তমান রীতি ও প্রবণতা অনুযায়ী ‘ঈদ’ না লিখে ‘ইদ’ লেখা উচিত। ‘ঈদ’ লেখা যেতে পারে কেবল প্রচলনের অনুরোধে। কোনো যুক্তিতে নয়। যাঁরা এরূপ যুক্তি তালাশ করেন, তাঁরা সাধারণত মূল উচ্চারণের দীর্ঘস্বরের যুক্তি দেখান। এই ‘যুক্তি’তেই একসময় বানানটি প্রচলিত হয়েছিল। কিন্তু এটি আসলে একটি অপযুক্তি। তার কারণ, বাংলায় কোনো নিয়মিত দীর্ঘস্বর না থাকায় আপনি ‘ঈদ’ বা ‘ইদ’ যা-ই লিখেন না কেন, ‘ইদ’ই উচ্চারণ করবেন। যেমন, আপনি বাঙালী/বাঙালি কিংবা গ্রীক/গ্রিক-যা-ই লিখেন না কেন, আসলে বাংলার নিয়মে হ্রস্বস্বরই উচ্চারণ করেন। কাজেই ‘ঈ’ দিয়ে মূল আরবির স্বর বাংলায় উচ্চারণ করানো সম্ভব নয়। যারা দীর্ঘস্বর উচ্চারণ করেন, তারা মূল শব্দটি জানেন বলেই এ রকম উচ্চারণ করেন, বাংলা বানান দেখে নয়।
কিন্তু বহু দশক ধরে, বিশেষত আমাদের ছাপা হরফের ব্যাপক প্রচলনের সময়জুড়ে, আমরা ‘ঈদ’ই লিখে আসছি। এর একটা ইতিহাস আছে। সেটা মনে করিয়ে দেওয়া সম্ভবত কাজের হবে। উনিশ-বিশ শতকে যাঁরা সংস্কৃতের অনুসরণে বাংলা বানানরীতি নির্ধারণ করেছিলেন, তাঁরা এমন বহু শব্দেও ‘ঈ’ লিখছিলেন, যেগুলো তৎসম শব্দ নয়। ফলে বিশৃঙ্খলা বাড়ছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরোক্ষ নেতৃত্বে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বানান কমিটি এ ব্যাপারে একটি ফয়সালা করেছিল। সেটা এ রকম : তৎসম শব্দের বানানে সংস্কৃত নিয়ম অনুযায়ী ‘ঈ’ লেখা হবে, কিন্তু অ-তৎসম শব্দের বানানে ‘ঈ’ চলবে না। এ নিয়ম তখন থেকে মোটের ওপর কার্যকর আছে। কিন্তু বিশ শতকের তৃতীয় বা চতুর্থ দশক থেকে ‘মুসলমানপক্ষ’ বলা শুরু করে, যদি সংস্কৃতসম শব্দগুলো ‘মূল’ বানান অনুযায়ী লেখা হতে পারে, তাহলে আরবিসম বা ফারসিসম শব্দগুলো কেন নয়? এ যুক্তিতেই আসলে প্রচুর ‘মুসলমানি’ শব্দে ‘ঈ’, ‘য’ ইত্যাদি লেখা হয়েছিল। কিন্তু আগেই বলেছি, এটি অপযুক্তি মাত্র। কারণ, কোনো ঋণ-করা শব্দই হুবহু ভাষায় আসে না, ঋণী ভাষার ধ্বনিতত্ত্ব মেনেই গৃহীত হয়। ফলে ‘ঈদ’ সংস্কারপন্থীদের দুর্বল সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায় প্রস্তুত অনুকরণমূলক বানানমাত্র।
আজ যে অনেকে ‘ইদ’ বানানে শব্দটি লিখতে চাচ্ছেন, তার কারণ, বাংলা বানানের রীতি ও বিধি ক্রমশ অধিক হারে ‘ই’ এবং ‘ই-কারে’র দিকে চলছে। বাংলা বানানের প্রতিষ্ঠিত বিধিগুলো, যেগুলো দিয়ে আমরা আর দশ বানান লিখে থাকি, সেগুলো ‘ইদ’ বানানের পক্ষেই। কিন্তু বানানের ক্ষেত্রে ‘প্রচলন’ নিয়মের মতোই শক্তিশালী। সে কারণেই যাঁরা দুই বানানের একটিকে ‘ভুল’ বলে সাব্যস্ত করছেন, তাঁরা ঠিক কাজ করছেন না। বলা দরকার, এটি বা ওটি অধিকতর গ্রহণযোগ্য। লেখার বাজারে দুটিই আরও কিছুদিন একত্রে থাকবে। অভিধানে অবশ্য প্রাধান্য পাবে ‘ইদ’ বানানটি। সঙ্গে দ্বিতীয় ভুক্তি হিসেবে থাকতে পারে ‘ঈদ’। কিন্তু পাঠ্যপুস্তকে লিখতে হবে ‘ইদ’। তা না হলে বানানের প্রচলিত নিয়মের সঙ্গে বিরোধ তৈরি হবে। দু-এক প্রজন্ম পরেই এ বানান নিয়ে কেউ আর কথা তুলবে না, যেমন ঘটেছে আরও বহু বাংলা বানানের ক্ষেত্রে।
মোহাম্মদ আজম: সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।


